বিশেষ সাক্ষাৎকার : ড.হোসেন জিল্লুর রহমান,” আমাদের নীতিগুলো দুর্নীতির সহায়ক”

0
Array

অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের চেয়ারপারসন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নানা সংকট এবং তার উত্তরণের পথ নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন।সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া ও রাফসান গালিব

এশিয়া ফাউন্ডেশন ও বিআইজিডির এক জরিপের ফল অনুযায়ী জনগণ মনে করে, অর্থনীতি ভুল পথে। জনগণের এই উপলব্ধিকে কীভাবে দেখছেন?

ড.হোসেন জিল্লুর রহমান: সামষ্টিক অর্থনীতি কীভাবে চলছে, সাধারণ জনগণের পক্ষ তা বলা সম্ভব নয়। তবে ব্যক্তি অর্থনীতি কীভাবে চলছে, তা তারা ভালোভাবে বুঝতে পারে। আয়-ব্যয়ের খরচ ও প্রাত্যহিক মূল্যস্ফীতি কোন পর্যায়ে আছে, বাজারে গেলে সে সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারে। ফলে ৭০ শতাংশ মানুষ যে বলছে অর্থনীতি ভুল পথে চলছে, তা বাস্তবভিত্তিক একটি পরিসংখ্যান হিসেবেই উঠে এসেছে। মানুষ সেটি কেন মনে করছে, তা তো জরিপেই উঠে এসেছে। তবে এর আরেকটি দিক আছে, এই পরিস্থিতিকে ঠিক করার উদ্দেশ্য বা ইচ্ছা আছে কি না।

সেখানেও জনগণ এই ইচ্ছার অনুপস্থিতি দেখতে পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই মূল্যস্ফীতির একটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ছিল, যেটি প্রযোজ্য ছিল হয়তো বছরখানেক আগে, এ মুহূর্তে তা এত বেশি প্রযোজ্য নয়। বিশ্বের অনেক জায়গায় এই সংকটে পড়া দেশগুলোয় মূল্যস্ফীতি কমে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশে হয়নি। কেন হয়নি? তার যে উত্তর জনগণ দিচ্ছে, তাতে একটি রাজনৈতিক বক্তব্যও প্রকাশ পাচ্ছে। তারা মনে করছে, ইচ্ছা করলেই হবে না, এখানে কিছু কাজও করতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন দেখা যাচ্ছে, গোষ্ঠীস্বার্থ ও ক্ষমতাসীনদের নীতি তৈরির বলয়গুলো এক হয়ে গেছে।

কিন্তু একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে আপনি কী মনে করছেন?

ড.হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতির কয়েকটি অবস্থা আছে। যেমন সামষ্টিক অর্থনীতি, মধ্যম অর্থনীতি এবং ব্যক্তি অর্থনীতি। শেষেরটি নিয়ে আমরা আলাপ করলাম। সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে আর্থিক খাত খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে, পরিসংখ্যানগুলোই তা বলছে। টাকার মান কমে গেছে, ডলার–সংকট তৈরি হয়েছে, আমদানিও কমিয়ে দিতে হয়েছে। আমাদের প্রবৃদ্ধি এখন প্রশ্নের মধ্যে পড়ে গেছে, রিজার্ভ কমে গেছে এবং ঋণ পরিশোধের বোঝাগুলো আরও ভারী হয়ে উঠছে। মধ্যম অর্থনীতির পর্যায়ে, শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব বিশাল আকার ধারণ করেছে। কর্মসংস্থানের দিকে তাকালে খুবই ধাঁধার মতো লাগে। ২০১৬ ও ২০২২ সালের শ্রম জরিপে দেখা যাচ্ছে, এ সময়কালে শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান কমে গেছে। বেড়েছে কৃষি খাতে। প্রবৃদ্ধির বিষয়টি আসলে কী হচ্ছে, কোথায় হচ্ছে—এর ব্যাখ্যা আমাদের খুঁজতে হবে। এখানে ব্যবসায় মন্দাভাব দেখা দিয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেছে। আবার অনেক প্রবৃদ্ধিও হয়েছে, কিন্তু এর ফসল কার ঘরে গেছে? সব মিলিয়ে বাংলাদেশ বড় ধরনের একটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

জরিপটিতে জনগণ রাজনৈতিকভাবে এক দলের কর্তৃত্বের কথাও বলেছে। এক দলের কর্তৃত্ব কোনো দেশের অর্থনীতির ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে বা ফেলে?

ড.হোসেন জিল্লুর রহমান: কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি এবং অর্থনীতি—এর সমীকরণগুলো কিন্তু একমাত্রিক নয়। বিভিন্ন দেশে সেটি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে কী হচ্ছে? গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া এবং তার ফলে মূল্যস্ফীতি কমছে না—এটি হচ্ছে কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির সরাসরি ফসল। এখানে এক দলের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং জনস্বার্থের কথা ভাবা হচ্ছে না। আর্থিক খাতে, ব্যাংকিং খাতে কেন এত বিশৃঙ্খলা? ঘুরেফিরে ননপারফর্মিং লোনের এমন অবস্থা কেন? ব্যাংকগুলোর মালিকানা বা পরিচালনা বোর্ডের বিষয়গুলো তো সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। অর্থনীতির পরিচালনায় এখানে বাংলাদেশ ব্যাংক কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখছে? জনগণের প্রাত্যহিক জীবন যেমন বড় সংকটে পড়েছে, তেমনি সার্বিকভাবে সুষম উন্নয়নের ভিত্তিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাও ব্যাহত হয়েছে।

এক দলের কর্তৃত্বের সঙ্গে অর্থনীতির দুর্দশা বা দুর্নীতির সম্পর্ক কতটুকু?

ড.হোসেন জিল্লুর রহমান: সম্পর্ক অবশ্যই আছে। এখানে নীতি প্রণয়নই করা হচ্ছে দুর্নীতির স্বার্থে। যেমন ব্যাংকের জন্য আইনগুলো করা হচ্ছে গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে। আরেকটি হচ্ছে আমাদের দেশে অবকাঠামোর প্রয়োজন আছে, এটি অনস্বীকার্য। কিন্তু একটি প্রবণতা গত এক দশকে বিশেষ করে দেখা যাচ্ছে এবং তা হচ্ছে মেগা প্রজেক্ট বা অবকাঠামো নিয়ে বেহিসাবি ও উচ্চমাত্রার পাবলিক ব্যয়। এই ব্যয় ঋণনির্ভর এবং সুদের হারও উচ্চ। বড় ধরনের দুর্নীতির ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এ ধরনের প্রকল্প। বহু অবকাঠামো আছে, যেগুলোর ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করে প্রকল্প নির্বাচন ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যার একটি উদাহরণ হতে পারে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন। সম্ভাব্যতা যাচাই ও মনিটরিংয়ের নামে বেহিসাবি অর্থ খরচ করা হয়েছে। কোন প্রকল্প অগ্রাধিকার দিতে হবে, তা মানা হয়নি। আগে আমরা দুর্নীতি বলতে বুঝতাম কিছু টাকা সরিয়ে রাখা। এখন নীতি প্রণয়নই করা হচ্ছে দুর্নীতির উদ্দেশ্যে।

এখন বিশ্বে দ্রুত ঋণ পাওয়ার অনেক সহজ উৎসও তৈরি হয়ে গেছে, যারা ঋণ দিচ্ছে সেই টাকা দিয়ে কী করা হচ্ছে, তা নিয়ে তারা চিন্তিত নয়। ফলে ১০ টাকার প্রকল্প এক হাজার টাকায় করা হচ্ছে। এখানে নিশ্চয়ই ভাগ-বাঁটোয়ারার বিষয় আছে। কিন্তু এই ঋণের টাকা তো ভবিষ্যতে আমাদের শোধ করতে হবে। আরেকটি বিষয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কাদের নির্বাচন করা হচ্ছে? আমরা ভেবেছিলাম ই-টেন্ডারের মাধ্যমে একটি বড় পরিবর্তন আসবে। কিন্তু ঘুরেফিরে তো কিছু নামই আসছে। এখানেও গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে।

রাজনীতিতে গণতন্ত্রের সংকট, মানবাধিকার, দুর্নীতির সংকট—এসব নিয়ে পশ্চিমাদের চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ অনেকটাই পশ্চিমের ওপর নির্ভরশীল। তারা নানা কিছুকে শর্তযুক্ত করে ফেলেছে। আমাদের অর্থনীতিতে এর কী প্রভাব পড়তে পারে?

ড.হোসেন জিল্লুর রহমান: দেখতে হবে, ওই চাপের সঙ্গে দেশের জনগণের চাহিদার মিল আছে কি না। দেখা যাচ্ছে এর মধ্যে জনগণের চাহিদার প্রতিফলন রয়েছে। এখন এ চাপের কারণে কী সংকট তৈরি হতে পারে, তা বলার আগে জনগণের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা সমস্যাগুলোর সমাধান কেন করছি না, সেই প্রশ্ন তুলতে হবে। জবাব খুঁজতে হবে জনগণের চাহিদার দিকে কেন আমরা আগে নজর দিচ্ছি না? গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের যেসব ইস্যুতে পশ্চিমা চাপ আসছে, সেগুলোর সঙ্গে অর্থনীতিও যুক্ত হয়ে পড়েছে। আরও বড় আলোচনা হচ্ছে, এই যে অর্থনীতি ভুল পথে চলছে, সেটিকে ঠিক পথে আনতে রাজনৈতিক যে সংস্কার দরকার, তা আমরা করছি না কেন? আমি তো মনে করি, গণতন্ত্রের জন্য তো বটেই, অর্থনীতির প্রয়োজনেই এখন রাজনৈতিক সংস্কার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

অর্থনীতি রাজনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি বিষয়। বাংলাদেশে এটা কীভাবে কাজ করছে? অভিযোগ আছে, অর্থনীতি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কোনো আলোচনা নেই। অংশীজনেরা চাইলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না।

ড.হোসেন জিল্লুর রহমান: নীতি হয়তো অন্য জায়গায় তৈরি হচ্ছে। ফলে তাদের মধ্যে ওই তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। এখানে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেই আলোচনা করা দরকার। দেখা যাচ্ছে, এখানে সেটি এক্সট্রিম সেন্ট্রালাইজেশনের (চরম এককেন্দ্রিকতার) দিকে গেছে। মানে গুটিকয় ব্যক্তির দিকনির্দেশনায় হচ্ছে সবকিছু। দৃশ্যত যাঁরা দায়িত্বে আছেন যেমন অর্থমন্ত্রী, অর্থসচিব, বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর—তাঁরা তো শুধু নিজেদের মধ্যে বুদ্ধি–সলাপরামর্শ করবেন না, রাষ্ট্রের ভেতরে-বাইরে যেসব ফোরাম আছে, তাদের সঙ্গেও আলাপ-আলোচনা করবেন। দুঃখজনক হচ্ছে, ফোরামগুলোতে প্রতিনিধিত্বমূলক কণ্ঠস্বর অনুপস্থিত হয়ে গেছে। অর্থনীতি ও বাণিজ্যসংক্রান্ত ফোরামগুলোতে সমঝোতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন হচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কার্যকর আলোচনার সব প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠান ও ফোরামগুলোর শানশওকত বাড়ছে। কিন্তু নীতি পরিচালনায় তারা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থের বিরুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছার অনুপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কারণ কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন ও গোষ্ঠীস্বার্থ অনেকটা একাকার হয়ে যাচ্ছে। সার্বিকভাবে এই শাসনের যারা প্রতিভূ, তারা সবাই একধরনের রঙিন চশমা পরে বসে আছে। এই রঙিন চশমায় তারা একটা অন্য জগৎ দেখছে। সারা বাংলাদেশের মানুষ একটি বাস্তবতা দেখছে আর রঙিন চশমা পরা কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকগোষ্ঠী অন্য আরেকটা বাস্তবতা দেখছে, যেখানে সবকিছু ভালো, সেখানে কোনো ভিক্ষুক নেই, কারও কোনো সমস্যা নেই, শহরগুলো বিশ্বের অন্যান্য উন্নত শহরগুলোর সঙ্গে তুলনীয় হয়ে উঠছে। দেশকে সঠিক অর্থনৈতিক রাস্তায় আনতে হলে এই রঙিন চশমা খোলাটাই হচ্ছে অন্যতম জরুরি রাজনৈতিক দায়িত্ব।

উন্নয়নের জন্য ধারাবাহিকতা থাকা বা গণতন্ত্রকে একটু ছাড় দেওয়া দরকার—এমন কথাবার্তা আমরা শুনে থাকি। এসব তত্ত্ব বা যুক্তিকে কীভাবে দেখেন আপনি?

ড.হোসেন জিল্লুর রহমান: উন্নয়নের জন্য ক্ষমতাসীনদের ধারাবাহিকতা অপরিহার্য কি না—এই প্রসঙ্গে আমরা তাত্ত্বিক আলোচনায় না গিয়ে পরিসংখ্যানগতভাবে বিষয়টি দেখতে পারি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে প্রতিটি শাসনেই একটি ধারাবাহিক উন্নতি হয়েছে। গত এক দশকে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র্য বিমোচনের সম্পর্কটা নাজুক হয়েছে, বেকারত্ব ও দুর্নীতি বেড়েছে, এটি অন্য আলাপ। কিন্তু গত ৫২ বছরের ইতিহাসে খাদ্য উৎপাদন, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক যে উন্নতি ঘটেছে; তাতে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ধারাবাহিকতা অপরিহার্য তো নয়ই, এটি গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ও নয়। মূল বিষয়গুলো হচ্ছে একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির বাস্তবতা এখানে আছে কি না। এবং সেটি নিশ্চিত করার জন্য প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতির বাস্তবতা এখানে আছে কি না। বাংলাদেশের এই অগ্রগতির পেছনে আসলে মূল শক্তি হিসেবে কাজ করেছে জনগণ মানে নারী, পুরুষ, কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা সবাই। উন্নয়নের জন্য ক্ষমতার ধারাবাহিকতা থাকা দরকার, এটি মূলত ক্ষমতাসীনদের স্বার্থভিত্তিক বক্তব্য, যা পরিসংখ্যান বা অর্থনীতির তত্ত্বের সঙ্গেও যায় না।

সামনে নির্বাচন, কিন্তু নির্বাচন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সংঘাত–সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত অর্থবছরকে সবচেয়ে খারাপ অর্থবছর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রাজনীতির এই অস্থিরতার চাপ নেওয়ার সক্ষমতা আমাদের অর্থনীতির আছে কি?

ড.হোসেন জিল্লুর রহমান: প্রাকৃতিক বা রাজনৈতিক ঝুঁকি বা দুর্যোগ মোকাবিলা করে সামনে এগোনোটাই হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তবে গত অর্থবছরের খারাপ পরিস্থিতি এবং সামনে ঋণ পরিশোধের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে বলতে হয়, সামনের দিনগুলোতে সংকট আরও ঘনীভূত হবে। ইউএসএইডের প্রতিবেদন বলছে, ১০ লাখ টনের মতো চাল আমাদের আমদানি করতে হবে। খাদ্য উৎপাদন বাংলাদেশের গত ৫০ বছরের অগ্রযাত্রার রক্ষাকবচ ছিল। নানা পরিস্থিতির মধ্যেও আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার জায়গাটি মজবুত ছিল। এখন এ জায়গা নিয়েও একটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি এখানে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষের ভোটের মূল্য কমে গেছে, বলা যায় একেবারে শূন্যে চলে এসেছে। একটি প্রতিযোগিতামূলক, অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এখন একদিকে বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে ঢুকেছে এবং অন্যদিকে সাধারণ মানুষের চাহিদা বা আশা-আকাঙ্ক্ষা পদদলিত হয়েছে। রাজনৈতিক নবায়ন ছাড়া এমন একটি পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো পথ নেই। অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়ানোর জন্যই সেই রাজনৈতিক নবায়ন হতে হবে, সেটি গণতন্ত্রের জন্যও। এখন এই রাজনৈতিক নবায়ন ক্ষমতাসীনদের হাত দিয়েও হতে পারে। তবে তাদের চোখে যে রঙিন চশমা, তা খুলে ফেলে বা তাদের শাসনের যে মডেল, সেটিকে বাদ দিয়ে তাদের একাংশের বিরুদ্ধে গিয়ে এ পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজনৈতিক এই নবায়নের বিষয়টি এখন আলোচনার টেবিলে আনতে হবে। সেটি আছে, তবে তা আরও জোরালোভাবে আনতে হবে।

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান মামলাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেকে তাঁর বিরুদ্ধে সরকারের হয়রানিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আপনার মন্তব্য কী?

ড.হোসেন জিল্লুর রহমান: এখানে আমি দুটি কথা বলব। একটি হচ্ছে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। আইনের শাসন একটি আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ, যা আমরা সবাই মানি বা স্বীকার করি। আরেকটি হচ্ছে হয়রানির উদ্দেশ্যে বা অভিপ্রায়ে রাষ্ট্রীয় বা বিচারিক কার্যক্রমের ব্যবহার। এবং এটা নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী। ড. ইউনূসের বিষয়ে দেখা যাচ্ছে, এখানে একটি ধূম্রজাল আছে, একধরনের সন্দেহ বা অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। তাকে মামলায় জড়ানোর পেছনে হয়রানিমূলক ইচ্ছাটা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্ন উঠেছে। ড. ইউনূস ক্ষুদ্রঋণের প্রবর্তক এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অগণিত পরিবার লাভবান হয়েছে। বাংলাদেশে এর কার্যক্রম সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জোরালোভাবে চলমান আছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে বিষোদ্‌গার বা নেতিবাচক প্রচারণা দেখা যাচ্ছে।

সেখান থেকেই হয়রানিমূলক ইচ্ছার একটি ধারণা পাই। দেশের বিভিন্ন খাতে শ্রমিককল্যাণ তহবিলের বিষয়টি কীভাবে কার্যকর হচ্ছে, সেসবের দিকে তাকালে বোঝা যাবে, চরমভাবে সিলেক্টিভভাবে এক ব্যক্তিকেই কেন্দ্র করে এটি ঘটছে। সেখানে এই একজনের ক্ষেত্রে মামলা; এখানে অন্য কোনো অভিপ্রায় আছে কি না? আমাদের যত মেধা আছে, সেসবের সন্নিবেশ করেই সেগুলোর সদ্ব্যবহার করে কিন্তু বাংলাদেশ এগিয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সামাজিক খাত বা বেসরকারি খাত সংকুচিত হয়ে আসছে, সেখানে অনেক নিয়মকানুন তৈরি করা হচ্ছে, তাতে তাদের উদ্ভাবনী শক্তি নিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার বিপরীতে কিন্তু এসব করা হচ্ছে। আমি বলব, সবাইকে মূল্যায়ন করে, সবাইকে নিয়ে ক্ষমতাসীন বা অন্যান্য সব রাজনৈতিক দলকেই চলা উচিত।

আপনাকে ধন্যবাদ।

ড.হোসেন জিল্লুর রহমান: আপনাদেরও ধন্যবাদ।

About Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • Click to Chat
  • Click to Chat
  • Click to Chat
  • Click to Chat