চট্টগ্রামে ভোটে আগ্রহ নেই সাধারণ মানুষের : নৌকা-ডামির লড়াইয়ে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে চিন্তিত প্রার্থীরা ; এ কেমন নির্বাচন!

0
Array

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আজ রোববার। ভোট গ্রহণের সব আয়োজন সম্পন্ন। অথচ যাদের জন্য এতো আয়োজন সেই ভোটারদের সাড়া নেই। নেই কোন উৎসাহ উদ্দীপনা। চট্টগ্রামে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এ কেমন নির্বাচন? ভোটে ফলাফল কী হবে তা তো সবার জানা, তাহলে ভোট দিয়ে কি হবে। কেউ বলেছেন, ভোট তো একেবারেই একতরফা। মাঠে একদিকে নৌকা, অন্যদিকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীও নৌকার সমর্থক।

এ তো ‘আমি আর ডামি’র ভোট। আওয়ামী লীগের কথায় বাকি যারা ভোটে আছেন তাদেরও কোনো জনসমর্থন নেই। কিংস পার্টির অবস্থা আরো খারাপ। এসব দলের প্রার্থীরা পোস্টারে ঝুলছেন, মাঠে তাদের কোনো তৎপরতা নেই। অবস্থা এখন এমন- ভোট যাকেই দেন, বিজয়ী হবে নৌকা। ফলে ভোট দেওয়া আর না দেওয়া- একই বলছেন ভোটারেরা।

মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং সমমনা দল ও জোটের বর্জনের মুখে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন একতরফা হয়ে পড়েছে। নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলো বলছে, দেশে নির্বাচনের নামে যা চলছে তা প্রহসন। টানা তৃতীয় বারের মতো ভোটারবিহীন নির্বাচন হতে যাচ্ছে। বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানিয়ে আসছে। টানা দশ দিন গণসংযোগ করে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা। নির্বাচন বাতিলের দাবিতে গতকাল সকাল থেকে শুরু হয়েছে ৪৮ ঘণ্টার হরতাল। ব্যাপক ধরপাকড় আর ভয়ভীতির মধ্যেই এসব কর্মসূচি সফল করার চেষ্টা করছেন বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা।

দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই এই ভোটে আওয়ামী লীগের টানা চতুর্থ বারের মতো ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত হলেও তাদের নেতাকর্মীরা এখন চরম দ্বিধাবিভক্ত। নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে এই দ্বিধাবিভক্তি। নির্বাচনে বেশি প্রার্থী দেখাতে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে দলের নেতাদের ডামি হিসেবে নির্বাচন করার সুযোগ দেওয়ায় আওয়ামী লীগে গৃহবিবাদ তুঙ্গে উঠেছে। এখানকার ১৬টি সংসদীয় আসনের ১২টিতেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে আছেন দলের মনোনয়ন বঞ্চিত নেতারা। কোনো কোনো আসনে একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন। ফলে নৌকা আর ডামি প্রার্থীর পেছনে দলের নেতাকর্মীরা ভাগ হয়ে গেছেন। কর্মীদের নিজের পক্ষে আনতে কোনো কোনো প্রার্থী দুহাতে টাকা বিলিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ভোটের লড়াইয়ে ১০টি আসেন মুখোমুখি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। প্রতিদিন তারা সংঘাত সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছেন। দলের মধ্যে এমন কলহ বিবাদে আওয়ামী লীগের র্নিলোভ সাধারণ কর্মী ও সমর্থকেরা ত্যাক্ত বিরক্ত। এমন ভোটে তাদেরও কোনো আগ্রহ নেই।

অথচ এদেশে ভোট মানেই নেতা-কর্মীদের জন্য উৎসব। দলীয় প্রার্থীদের জিতিয়ে আনতে প্রাণপণ লড়াই। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়ায় এখন ভোটের মাঠে নেই কোনো উত্তাপ উত্তেজনা। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মাঝে নেই কোনো উচ্ছ্বাস। ভোটের প্রচারে যা হয়েছে রীতিমত আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের মাঠে প্রভাব বিস্তারের লড়াই।

ভোটের আগেই ফলাফল জানা। গতকাল তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচনে ধস নামানো বিজয় নিয়ে ফের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন শেখ হাসিনা। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভোট নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। বরং একতরফা নির্বাচনের পর পরিস্থিতি কি হবে তা নিয়ে উদ্বেগ উৎকন্ঠা সর্বত্রই। টানা কর্তৃত্ববাদী শাসনের সুযোগে দেশ থেকে ব্যাপক পুঁজি পাচার হয়ে গেছে। ফলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নাজুক। ব্যাপক লুটপাটের কারণে আর্থিক খাতে চরম নৈরাজ্য চলছে। নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতিতে মানুষ দিশেহারা। সমাজে আয় বৈষম্য অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক মহলের সকল চাপ উপেক্ষা করে তৃতীয় বারের মতো একতরফা ভোটের পর দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আরো ধসে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বলা হচ্ছে তৈরি পোশাক রফতানিসহ বিভিন্ন খাতে নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। ফলে ভোটের পরে কি হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় সাধারণ মানুষ। রোববারের এমন একতরফা ভোট অনেকের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে ভোটের দিনকে ঘিরে পুরো চট্টগ্রামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা আয়োজন চলছে। রাস্তায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর টহল চলছে, মাঠে রয়েছে সেনাবাহিনী। পুলিশ ও র‌্যবের সাথে আধা সামরিক বাহিনী বিজিবির টহল চলছে। এর মধ্যে তিন ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়া হয়েছে। নৌকার প্রার্থীদের হুমকি ধমকি আর হুঙ্কার চলছে সমানতালে। বাঁশখালী আসনের নৌকার প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী তার কর্মীদের গায়ে হাত দিলে পুলিশের হাত কেটে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ওসিকে। সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের নৌকার প্রার্থী আবু রেজা নদভী ভোটের দিন ২০-৩০টা মার্ডার হয়ে যাবে বলে পুলিশের উদ্দেশ্যে হুঙ্কার ছেড়েছেন। এসব ঘটনায় এলাকায় ভোটের আমেজের বদলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রকৃতিতে শুরু হয়েছে শীতের কামড়। এমন পরিস্থিতিতে ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কেমন হবে তা নিয়ে চিন্তিত প্রার্থীরা। তবে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে প্রার্থীরা মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছেন। সরকারি প্রশাসনের সহায়তা পাচ্ছেন তারা। নগরীর বস্তি ও শ্রমিক এলাকার লোকজনকে ভোটকেন্দের সামনে এনে জড়ো করতে টাকা ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। ভোটার হোক বা না হোক কিছু লোককে কেন্দ্রের সামনে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখার কৌশল নেওয়া হয়েছে। তাতে মিডিয়ায় দেখানো যাবে ভোটারের উপস্থিতি ভাল। এই কাজে দলীয় ক্যাডাদের সাথে পাড়ার মাস্তানদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা ভোটারদের যেভাবেই হোক কেন্দ্রে হাজির করার মিশনে নেমেছে বলেও জানা গেছে। ভোটারদের প্রকাশ্যে টাকা বিলির ঘটনায় পটিয়া আসনে নৌকার প্রার্থী মোতাহেরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হুইপ শামসুল হকের দুই সমর্থককে টাকা বিলির সময় হাতেনাতে আটক করা হয়েছে।

ভোটারেরা বলছেন, বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভোট হয়েছে, ভোটারের প্রয়োজন হয়নি। ২০১৮ সালে ভোট রাতেই নেওয়া হয়ে গেছে। কেন্দ্রে গিয়েও ভোট না দিয়ে ফিরতে হয়েছে। এবার ভোটের দরকার নেই। তবে কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি দরকার। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সচেতন মানুষ ডামি ভোটে ডামি ভোটার হবেন কি না তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।

About Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • Click to Chat
  • Click to Chat
  • Click to Chat
  • Click to Chat