রোডম্যাপে গতি আস্থায় ঘাটতি

0
Array

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র চার মাস। নির্বাচন সফলভাবে আয়োজন করতে গত বছর একগুচ্ছ কাজের কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ তৈরি করে নির্বাচন কমিশন। সে অনুযায়ী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা জানিয়েছে কমিশন।

রোডম্যাপ থেকে কোনোভাবেই যেন পিছিয়ে না পড়ে সে বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ (সিইসি) চার কমিশনারের রয়েছে কড়া নির্দেশনা।

ইসির তথ্যমতে, রোডম্যাপের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু সব দলকে নির্বাচনে আনার ক্ষেত্রে ইসির দিক থেকে কোনো ধরনের অগ্রগতি নেই। বিশেষ করে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে আনার প্রশ্নে ও নিজেদের প্রতি দলগুলোর আস্থা অর্জনে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোন ফল আনতে পারেনি। এ পর্যন্ত সীমিত আকারে যেসব আলাপ-আলোচনা হয়েছে, তাও কোনো কাজে আসেনি।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোডম্যাপ নির্বাচন কমিশনের একটি রুটিন কাজের রূপরেখা। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের চ্যালেঞ্জের কথা তারা উল্লেখ করলেও কিন্তু কীভাবে এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়ে কিছু বলেনি। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনে নিয়ে আসাই হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের বড় চ্যালেঞ্জ।

গত বছর সেপ্টেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা উন্মোচন করে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত পরিকল্পনার মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা সৃষ্টি। নির্বাচনের দায়িত্বে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের, বিশেষ করে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন এবং ব্যবহৃত ইভিএমের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা সৃষ্টি উল্লেখযোগ্য।

কর্মপরিকল্পনার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল ইভিএম। বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫০টি আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের ঘোষণা দেয়। যদিও আর্থিক সংকট দেখিয়ে দুই লাখ ইভিএম কেনার পরিকল্পনা স্থগিত করে সরকার। পরে চলতি বছর এপ্রিলে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে নির্বাচন কমিশন। ৩০০ আসনেই ব্যালট পেপারে ভোট নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি।

রোডম্যাপ অনুযায়ী এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ কাজ শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। নতুন ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয়। এরপর আইনি কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেয় কমিশন। তাতে ইসি নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের পরও ফলাফল বাতিলের ক্ষমতাসহ বেশ কিছু আইন পরিবর্তনের সুপারিশ ও প্রস্তাব পাঠায়, যা জাতীয় সংসদে পাস হয়ে আইন পরিণত হয়েছে। সংসদীয় আসনের পুনর্বিন্যাসের কাজ শেষ করেছে ইসি। ১০টি সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন এনেছে কমিশন। এ ছাড়া নতুন দলের নিবন্ধনের কাজও শেষ হয়েছে। যদিও নিবন্ধন পাওয়া দুটি দল নিয়েই বিতর্ক উঠছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রের খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিরীক্ষার কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এ ছাড়া ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের কাজসহ অন্য কাজ চলমান রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর ভোটকেন্দ্রের তালিকা, আসনওয়ারি ভোটার তালিকার সিডি প্রস্তুত ও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ঠিক করার কার্যক্রমও চলছে।

নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের রুটিন অনুযায়ী কাজগুলো শেষ করা হচ্ছে। তবে বেশিরভাগই কাজ শেষের পথে। কিছু কাজ আছে যার শতভাগ শেষ হয়েছে। আবার কিছু কাজ রয়েছে যেটা চলতি মাসেই শেষ হওয়ার কথা। নির্বাচন ব্যবস্থাপনা অ্যাপ নভেম্বরের মধ্যে চালু করা হবে। ওই সময়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে যাবে। তখন অনলাইনে মনোনয়ন জমার ব্যবস্থা রাখতে হলে অ্যাপ চালু করতে হবে।’

তিনি বলেন, নির্বাচনী কেনাকাটার কাজ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত শেষ হয়েছে। শুধু একটা আইটেম বাকি রয়েছে। কিছু আইটেম তারা ইতিমধ্যে গ্রহণ করা শুরু করেছেন। এ ছাড়া প্রশিক্ষণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর ব্যালট পেপারের জন্য যথাসময়ে কাগজ সংগ্রহ ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়ের পর মুদ্রণের কাজ করবে।

এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপিসহ সমমান দলগুলো। বিএনপি বলছে, এই রোডম্যাপ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি বলেছে, এ নির্বাচন কমিশনের কোনো ক্ষমতা নেই। তাই তাদের রোডম্যাপেরও কোনো মূল্য নেই। এ ছাড়া বাম দলগুলো বলছে, সরকারের আস্থাভাজন ও অনুগত ব্যক্তিদের নতুন নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক মতৈক্য ছাড়া ঘোষিত এ নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা রাখার কোনো অবকাশ নেই।

কমিশন বলছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর আস্থার ঘাটতির কারণে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবে নিজেদের কর্মকা- দিয়ে আস্থা অর্জনের পথে তারা কিছুটা হলেও এগিয়ে গেছে। কমিশনের মতে, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করাই তাদের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্দেশ্য।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসির কর্মপরিকল্পনার কাজ গতানুগতিক ধারাতেই হচ্ছে। রোডম্যাপে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের কিছু চ্যালেঞ্জের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। তবে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সামনে রাজনৈতিক সংলাপ বা সমঝোতার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তারা।

তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আর কোনো সংলাপ নিয়ে ভাবছে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয় রাজনৈতিকভাবেই সমাধান হবে বলে মনে করছে নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থাটি।

এর আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কমিশনের এমন অবস্থানের কথা জানান নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করবে কমিশন। তত্ত্বাবধায়ক নাকি দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন হবেÑ তা নিয়ে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি রাজপথে আন্দোলন করছে। আন্তর্জাতিক মহল থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংলাপের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন কোনো সংলাপ করবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান বলেন, ‘সংলাপ নিয়ে আমরা ভাবছি না। আমাদের সংলাপের আর প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমি মনে করি না। রাজনৈতিক বিষয় রাজনৈতিকভাবেই সমাধান হবে।’

ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) সভাপতি মুনিরা খান মনে করেন, নির্বাচন কমিশন তার রুটিন ওয়ার্ক করছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের বাইরে বড় কাজ হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোকে আশ্বস্ত করা যে, তারা একটা ভালো এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারবে। যদি কোনো রাজনৈতিক দল মনে করে ইসির প্রতি বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে, তাহলে একবারের জায়গায় দশবার সংলাপের আয়োজন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইসির বেশি আগ্রহ থাকা উচিত। যেহেতু তারা (ইসি) দেখছে তাদের প্রতি দলগুলোর আস্থার ঘাটতি রয়েছে, সেহেতু তাদের উচিত আবারও সংলাপের আয়োজন করা।

About Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • Click to Chat
  • Click to Chat
  • Click to Chat
  • Click to Chat