সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ‘আন্দোলনের ফসল’ ঘরে তুলতে চায় বিএনপি

0
Array

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করতে চায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। আগামী ১ সেপ্টেম্বর দলটির ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে বড়োসড়ো শোডাউনের প্রস্তুতি চলছে। সেই শোডাউন থেকেই সরকার পতনের চলমান এক দফার যুগপৎ আন্দোলনের লাগাতার কর্মসূচি আসতে পারে, যা পর্যায়ক্রমে চূড়ান্ত আন্দোলনে রূপ নেবে। আর এ পথ ধরেই সেপ্টেম্বরের মধ্যে আন্দোলনের কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে তুলতে মরিয়া দলটি। লক্ষ্য অর্জনে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি জোট শরিক এবং যুগপৎ আন্দোলনে মাঠে থাকা সরকারবিরোধী বিভিন্ন জোট ও সমমনাদেরও প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

বিএনপিসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন দল ও জোটের নেতারা জানিয়েছেন, দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে যে করেই হোক সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে। আগামী এক মাসের মধ্যেই তারা কাঙ্ক্ষিত বিজয় নিশ্চিত করতে চান।

বিএনপির দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে ১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় বড় শোডাউন করতে চায় বিএনপি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে র‌্যালি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই র‌্যালি গত ২৮ জুলাইয়ের মহাসমাবেশের রূপ দিতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ কর্মসূচি পালনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাছে সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। ওই র‌্যালি থেকে পরবর্তী কর্মসূচির ঘোষণা আসতে পারে।

জানা গেছে, বিএনপি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে থাকতে চায়। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে বিক্ষোভ ও পদযাত্রা কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সেসব কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের দিক থেকে কোনো ধরনের বাধা এলে আর নরম কর্মসূচিতে থাকবে না দল। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝির পর থেকে ‘অবরোধ, অবস্থান ধর্মঘট ও ঘেরাও কর্মসূচি’র মতো কঠিন পদক্ষেপের পথ বেছে নেবে বিএনপি। চূড়ান্ত দাবি আদায়ে সড়ক, রেল ও নৌপথ অবরোধেও যেতে পারে। এমনকি সরকারি অফিস- যেমন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, স্থানীয় নির্বাচন কার্যালয়, থানা, জেলা প্রশাসক কার্যালয় ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। আন্দোলনের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে সচিবালয়, নির্বাচন কমিশন ও গণভবন ঘেরাওয়ের মধ্য দিয়ে। এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে লাগাতার অবস্থান ধর্মঘটের কর্মসূচি দেওয়ার পক্ষেও দলীয় সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

এসব কর্মসূচির পরও সরকার দাবি না মানলে লাগাতার অবরোধ বা হরতালের ডাক দিতে পারে বিএনপি। এছাড়া অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দলটি এবার আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ‘ঢাকাকে পাখির চোখ’ করেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতা এখন চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন। দলের পক্ষ থেকে চিকিৎসার কথা বলা হলেও বিদেশে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে জ্যেষ্ঠ নেতাদের ‘বিশেষ বৈঠক’ হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। আগামী ২৯ আগস্ট লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের সঙ্গে দলীয় নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হতে পারে। আগামী দিনে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনের নতুন রূপরেখা আসতে পারে ওই বৈঠক থেকে।

চলমান আন্দোলন ঘিরে পুলিশি গ্রেফতারের বিষয়টিও মাথায় রাখছে বিএনপি। শীর্ষ নেতারা বা সহযোগী সংগঠনের প্রথম সারির নেতারা গ্রেফতার হলে বিকল্প নেতৃত্বে কারা দায়িত্ব পালন করবেন, সে বিষয়েও হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। শীর্ষ নেতারা গ্রেফতার হলে আন্দোলনে যেন ভাটা না পড়ে সেজন্য দলটিতে তিন ধাপের নেতৃত্ব বাছাই করা হয়েছে।

দলের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির আন্দোলনে মাঠের শক্তিতে জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি বড় ফ্যাক্টর। দীর্ঘদিন খোলসবন্দি থাকলেও নিবন্ধন নিয়ে আইনি লড়াইয়ে থাকা দলটি সম্প্রতি রাজনৈতিকভাবেও সক্রিয় হচ্ছে। গত ১০ জুন রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিশনে সমাবেশ করে নিজেদের সক্ষমতার জানান দেয় জামায়াত। দলটি আগামীতে বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষত, মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ঢাকায় জানাজা করতে না দেওয়ার বিষয়টি ভালোভাবে নেননি দলটির নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যে কঠোর আন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়ে জামায়াত নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুদ নেতাকর্মীদের সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

গত এক মাসে জামায়াতের ঘরোয়া বৈঠকে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন ও কারারুদ্ধ নেতাদের মুক্তি দাবিতে আগামীতে সর্বশক্তি নিয়ে কর্মীদের মাঠে নামার প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। বিএনপির সঙ্গে জামায়াত নেতাদের বর্তমানে পর্দার আড়ালে নিয়মিত কথা হচ্ছে বলেও খবর রয়েছে। বিএনপি শক্তভাবে মাঠে নামলে জামায়াতও মাঠে থাকবে বলে দল দুটির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এছাড়া সাঈদীর মৃত্যুতে বিএনপির প্রতিক্রিয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখছে জামায়াত।

সরকার পতনের চলমান যুগপৎ আন্দোলনে জামায়াত ছাড়াও সরকারবিরোধী অন্যান্য দল ও জোট এখন বিএনপির পাশাপাশি মাঠে সক্রিয়। আগামীতে এসব বিরোধী শক্তি আরও জোরালোভাবে মাঠে নামার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

গত ১৮ আগস্ট রাজশাহীর এক বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ২০২৩ সালেই, আর দুই মাসের মধ্যে এ সরকারের পদত্যাগ হবে। এর পরের সরকার বিএনপি সরকার। এর পরের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। আপনারা লাগাতার আন্দোলন করেছেন। কয়েকটা দিন কর্মসূচি পালন করতে হবে। এ সরকারের পদত্যাগ নিশ্চিত করেই আমরা বাড়ি ফিরবো; খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে বের করে আনবো।

তিনি বলেন, বিএনপিকে এখন আর কেউ ‘হাঁটু ভাঙা পার্টি’, ‘মাজা ভাঙা পার্টি’ বলে না। ঢাকায় মহাসমাবেশের পর এসব বলা বন্ধ হয়ে গেছে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, সরকারের নির্বাচন নির্বাচন খেলা শুরু করার আগেই যেন আমরা একটা ফলাফল নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের সামনে উপস্থিত হতে পারি, সে চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, আগামীতে দাবি আদায়ে এক দফার আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি শিগগির যে আন্দোলনের ডাক দেকে দেবে সেখানে শরিকদের সর্বাত্মকভাবে মাঠে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও জাপা (জাফর) নেতা মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, বিএনপির সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে বৈঠকে কর্মসূচির ধরন ও কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমাদের সিরিয়াসলি মাঠে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনই সরকার পতনের ভরসা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সবাই এখন জানে আওয়ামী লীগের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। মার্কিন ভিসানীতি এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ক্রমাগতভাবে বিদেশিরা সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলছেন। তারা জানেন, গত দুটি নির্বাচনে মানুষ এখানে ভোট দিতে পারেনি।

তিনি বলেন, নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। শান্তিপূর্ণভাবে এক দফা আন্দোলনের জন্য বিএনপি ও তার জোট তথা সমমনা মিত্ররা প্রস্তুত। এক দফার আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। পদত্যাগের আগে সরকার টোপ হিসেবে সংলাপ ডাকতে পারে। তাতে বিএনপির যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করাতে রাজপথের আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।

About Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • Click to Chat
  • Click to Chat
  • Click to Chat
  • Click to Chat