ব্রিকসে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি,নিষেধাজ্ঞায় পড়তে পারে এমন দেশের ব্যাপারে আপত্তি জানায় ভারত

ব্রিকস সম্মেলনে ভারত ও ব্রাজিলই ফ্যাক্টর হয়ে রইলো। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রস্তাবে দৃশ্যত আটকে গেছে ব্রিকসে নতুন অনেক সদস্যকে অন্তর্ভুক্তি। তিনি প্রস্তাব করেছেন, নতুন যেসব সদস্য ব্রিকসে নেয়া হবে তারা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার টার্গেটে থাকতে পারবে না। অন্যদিকে ব্রিকস সম্প্রসারণের মাধ্যমে চীন তার প্রভাব আরও বৃদ্ধিতে উদগ্রীব। তবে বিষয়টি ভালো চোখে দেখছে না ভারত। ব্রিকস সম্প্রসারণে চীনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডা সিলভা।
এসব কারণে এবারে ১৫তম ব্রিকস সম্মেলনে শেষ মুহূর্তে বিভক্তি দেখা দেয় নেতাদের মধ্যে। দৃশ্যত অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। ‘ব্রিকস এক্সপ্যানসন ফেসেস ইলেভেনথ আওয়ার হার্ডল অ্যাজ ডিভিশন্স পারসিস্ট’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে রয়টার্স লিখেছে, বৈশ্বিক বিষয়ে ‘গ্লোবাল সাউথ’কে আরও প্রভাবশালী, উচ্চাকাক্সক্ষী করার যে বাসনা তার প্রতি এ ঘটনাকে দেখা হচ্ছে হুমকি হিসেবে। এতে নতুন সদস্য নেয়ার ব্যাপারে ভারত তার আপত্তির কথা তুলে ধরে।
জানায় নতুন যেসব সদস্যকে ব্রিকসে অন্তর্ভুক্ত করা হবে তারা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার টার্গেটে থাকতে পারবে না। ব্রিকস হলো বর্তমানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার একটি অর্থনৈতিক জোট। এতে কয়েক ডজন দেশ যোগ দেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।
অন্যদিকে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ব্রিকসকে গড়ে তুলতে চাপ দিচ্ছে বেইজিং ও মস্কো। জোহানেসবার্গের এই তিনদিনের সামিটে ব্রিকসকে সম্প্রসারণ নিয়ে বিতর্ক হয়ে ওঠে শীর্ষ এজেন্ডা। যখন এর সব সদস্য প্রকাশ্যে ব্রিকস সম্প্রসারণে সমর্থন প্রকাশ করেন, তখন কতো সংখ্যক সদস্য নেয়া হবে এবং কতো তাড়াতাড়ি নেয়া হবে তা নিয়ে নেতাদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। আয়োজক দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নালেদি প্যান্ডোর গত বুধবার বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, নতুন সদস্য নেয়ার বিষয় বিবেচনা করতে একমত হয়েছেন ব্রিকস নেতারা। তার মন্ত্রণালয় পরিচালিত রেডিও স্টেশনে তিনি এ বার্তা দেন। ব্রিকসের সদস্য হতে চায় এমন দেশগুলোর জন্য আমরা কিছু গাইডলাইন, নীতি গ্রহণ করেছি। এসব দেশকে নেয়ার বিষয় বিবেচনায় নিয়েছি। তবে ব্রিকসের সদস্য একটি দেশের একজন কর্মকর্তা তখন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, তখন পর্যন্ত অনুমোদন কাঠামো অনুমোদন দেয়ার চূড়ান্ত ঘোষণায় নেতারা স্বাক্ষর করেননি।
গত বুধবারের অধিবেশনের পরই একটি চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সূত্রগুলোর উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স বলছে, নতুন সদস্য নেয়ার ক্ষেত্রে কিছু মানদণ্ড উত্থাপন করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এতেই ব্রিকস সম্প্রসারণ চুক্তি বিলম্বিত হয়। বিলম্বের এ বিষয়ে জানেন ভারতের এমন একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে গত বুধবার বলেন, আলোচনা তখনও চলছিল। তিনি বলেন, মানদণ্ডের পাশাপাশি প্রার্থীদের নামের বিষয়ে ঐকমত্যের জন্য চাপ দিয়েছে ভারত। বিষয়টি ছিল বিস্তৃত বোঝাপড়ার।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক শক্তি এবং সরকারগুলো প্রায়শই ভিন্ন বিদেশি নীতির লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে ব্যাপকভাবে ভিন্ন। যে সংগঠন বা ব্লকের প্রতিটি সদস্যের একই সমান ভেটো দেয়ার ক্ষমতা আছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে, সেখানে এটি একটি জটিল ফ্যাক্টর। এই ব্লকে সবচেয়ে হেভিওয়েট চীন। তারা ব্রিকসকে সম্প্রসারণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আহ্বান জানিয়ে আসছে। পশ্চিমাদের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার উপায় হিসেবে এমনটা দেখছে চীন। গত বুধবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, অস্থিরতা ও পরিবর্তনের নতুন এক যুগে প্রবেশ করেছে বিশ্ব। ব্রিকসভুক্ত দেশ হিসেবে আমাদেরকে সবসময় আমাদের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য মনে রাখতে হবে। তা হলো একতার ভিত্তিতে আমাদের নিজেদের শক্তিশালী করা।
ওদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। এ কারণে এ সম্মেলনে তিনি সশরীরে যোগ দিতে পারেননি। তিনি নিজের দেশে অবস্থান করে ভার্র্চ্যুয়াল মাধ্যমে যোগ দিয়েছেন। এরমধ্য দিয়ে তিনি পশ্চিমা শক্তিগুলোকে দেখাতে চেয়েছেন যে, এখনো তার বন্ধু আছে। পক্ষান্তরে পশ্চিমাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে ব্রাজিল এবং ভারত উভয়েই। যুক্তরাষ্ট্র এবং সম্পদশালী অর্থনীতির দেশগুলোর গ্রুপ অব সেভেন বা জি৭-এর প্রতিপক্ষ হয়ে উঠবে ব্রিকস এমন ধারণাকে মঙ্গলবার প্রত্যাখ্যান করেছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা ডা সিলভা।
ব্রিকসের সদস্য একটি দেশের একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, নতুন সদস্য নেয়ার ক্ষেত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মানদণ্ড প্রস্তাব করেন। এরমধ্যে যেসব দেশ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার টার্গেটে আছে তাদেরকে সদস্য করা যাবে না। অর্থাৎ প্রার্থী দেশকে এমন হতে হবে, যাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি নেই। এ ছাড়া মাথাপিছু সর্বনিম্ন জিডিপি নির্ধারণের প্রস্তাব দেন মোদি। ওই কর্মকর্তা বলেছেন, নরেন্দ্র মোদি এসব বিষয় বুধবার উত্থাপন করেছেন। এ নিয়েই কিছুটা বিভক্তি দেখা দেয়।
রয়টার্সের খবরে আরও বলা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকার কর্মকর্তারা বলেছেন- কমপক্ষে ৪০টি দেশ ব্রিকসে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তার মধ্যে ২২টি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়ার অনুরোধ করেছে। সম্ভাব্য এসব প্রার্থীর মধ্যে ইরান থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত আছে। বিশ্ব শৃঙ্খলার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য ব্রিকসের প্রতিশ্রুতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে তারা। সামিটের শেষদিন গত বৃহস্পতিবার এই ব্লকের নেতাদের সঙ্গে মিটিং করতে এরমধ্যে কয়েকটি দেশের প্রার্থিতার বিষয়ে জোহানেসবার্গে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে।
বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৪০ ভাগের বসবাস ব্রিকসে। বৈশ্বিক মোট জিডিপি’র এক চতুর্থাংশের মালিক তারা। তা সত্ত্বেও ব্রিকস সদস্যদের একটি সুসঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে মীমাংসা করতে ব্যর্থতা আছে দীর্ঘদিন ধরে। এটি বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ‘প্লেয়ার’ হিসেবে ক্রমশই নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান গত মঙ্গলবার বলেছেন, সমালোচনামূলক বিষয়ে ব্রিকস দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার কারণে, এই ব্লকটিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে বলে দেখছেন না।
তবে ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং বহুজাতিক ঋণদাতা হিসেবে বিকল্প নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় পশ্চিমা অনেকের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।